বুধবার, ১০ জুন, ২০২০

দেবতারা যখন অপকর্মে জড়িত!

দেবতাদের আমরা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ভাবতেই ভালোবাসি। ভক্ত বিশ্বাস করে, ভগবান কেবলই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে থাকেন। কিন্তু সেই দেবতাই যদি হয়ে ওঠে শয়তান, লম্পট ও ধর্ষক? তবে কি মানুষ তার বিবেকের কাঠগোড়ায় দেবতাকেও দাঁড় করাবে? নাকি ক্ষমতাবলে ছাড় পেয়ে যাবে ভ্রষ্ট দেবতা? বর্তমান সময়ে নারীদের উপর বেড়ে চলা সহিংসতা,ধর্ষণ আমাদের যখন বিব্রত করে চলেছে তখন ধর্মগ্রন্থগুলোতে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে সত্যযুগ থেকে কলিযুগ অবধি কিছুই বদলায়নি। কলির অধঃপতিত পুরুষের মত সত্যের পরমপূজ্য ঋষি,দেবতারাও ধর্ষণের ন্যায় অপকর্মে জড়িত।

বৃহস্পতি
প্রথমে দেবগুরু বৃহস্পতির কথা দিয়ে শুরু করা যাক।দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি তার ভ্রাতৃবধূ মমতাকে ধর্ষণ করেন। বৃহস্পতির ভাই ছিলেন উতথ্য ঋষি। তার স্ত্রী হলেন মমতা। একদিন বৃহস্পতি কামাতুর মনে মমতার কাছে উপস্থিত হন। তাকে দেখে মমতা জানান তিনি তার স্বামী অর্থাৎ বৃহস্পতির দাদা উতথ্য ঋষির দ্বারা গর্ভবতী হয়েছেন। এক গর্ভে যেহেতু দুই সন্তানের স্থান হওয়া অসম্ভব এবং বৃহস্পতিও অমোঘরেতাঃ তাই মমতা বৃহস্পতির সাথে মিলিত হতে অসম্মতি জানান-

“হে মহাভাগ! আমি তোমার জ্যেষ্ঠের সহযোগে অন্তর্বত্নী হইয়াছি, অতএব রমণেচ্ছা সংবরণ কর। আমার গর্ভস্থ উতথ্যকুমার কুক্ষিমধ্যেই ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ণ করিতেছেন। তুমিও অমোঘরেতাঃ ; এক গর্ভে দুইজনের সম্ভব নিতান্ত অসম্ভব।অদ্য এই দুব্যবসায় হইতে নিবৃত্ত হও।”

মমতার অসম্মতি সত্বেও দেবগুরু বৃহস্পতি তাকে ধর্ষণ করেন। বৃহস্পতিকে ধর্ষণ করতে দেখে মমতার গর্ভস্থ শিশু বলে ওঠে, “ভগবন! মদনাবেগ সংবরণ করুন। স্বল্পপরিসরে উভয়ের সম্ভব অত্যন্ত অসম্ভব। আমি পূর্বে এই গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, অতএব অমোঘরেতঃপাত দ্বারা আমাকে পীড়িত করা আপনার নিতান্ত অযোগ্য কর্ম হইতেছে, সন্দেহ নাই।”

বৃহস্পতি গর্ভস্থ শিশুটির কথায় কর্ণপাত না করে তার নিকৃষ্ট কাজ করতে থাকেন। গর্ভস্থ শিশু বৃহস্পতির এই অন্যায় আচরণ দেখে নিজের পা দিয়ে শুক্রের পথ রোধ করেন।বীর্য মমতার গর্ভে প্রবেশ করতে না পেরে মাটিতে পতিত হয়। এতে রেগে গিয়ে বৃহস্পতি সেই শিশুটিকে অন্ধ হওয়ার অভিশাপ দেন।পরে ওই শিশুটির নাম হয় দীর্ঘতমা।

[কালিপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদিত মহাভারত / আদিপর্ব / চতুরধিকশততম অধ্যায় (১০৪ অধ্যায়)]
চন্দ্র
চন্দ্র দেবতা বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে ধর্ষণ করেছিলেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এই ঘটনাটি উল্লেখিত আছে –

“তারারে হরণ করে দেব শশধর।

তারাদেবী গর্ভবতী হয় অতঃপর।।

সগর্ভা তারারে হেরি গুরু বৃহস্পতি।

ভর্ৎসনা করিল তারে ক্রোধভরে অতি।।

লজ্জিত হইয়া তারা চন্দ্রে দিল শাপ।

শুন শুন চন্দ্র তুমি করিলে যে পাপ।।

কলঙ্কী হইবে তুমি তাহার কারণ।

তোমার দর্শনে পাপ হবে অনুক্ষণ।।“

[ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ/ কৃষ্ণ জন্ম খন্ড/৮০ অধ্যায়,অনুবাদক- সুবোধ চন্দ্র মজুমদার]
অশ্বীনিকুমার
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে অশ্বীনিকুমারের এক ব্রাহ্মণীকে ধর্ষণের ঘটনা উক্ত হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে (ব্রহ্মখণ্ড/১০) বলা হয়েছে,

“শৌনক কহিলা সৌতি না পারি বুঝিতে

অশ্বীনিকুমার কেন রত ব্রাহ্মণীতে।।

সৌতি কহে মুনিবর দৈবের ঘটনা ।

ব্রাহ্মণী তীর্থেতে যায় অতি সুদর্শনা।।

পথশ্রমে ক্লান্ত অতি বিশ্রাম কারণ।

পশিল দেখিয়া এক নির্জন কানন।।

ব্রাহ্মণী বসিয়া আছে বিশ্রামের আশে।

অশ্বীনিকুমার দৈবযোগে তথা আসে।।

তাহারে দেখিয়ে পথে অশ্বীনিকুমার।

সৌন্দর্যবিমুগ্ধ মনে কাম জাগে তার।।

সুন্দরীর রূপ দেখি কাম জাগে মনে।

তাহারে ধরিতে যায় অতি সঙ্গোপনে।।

রূপবতী সতী নারী নিষেধ করিল।

কামার্ত অশ্বীনিপুত্র তাহা না শুনিল।।

নিকটেই মনোহর ছিল পুষ্পোদ্যান।

সবলে আনিয়া সেথা করে গর্ভাধান।।

লজ্জ্বা ভয়ে ব্রাহ্মণী সে গর্ভত্যাগ করে।

তখনি জন্মিল পুত্র ধরার উপরে।।“

[অনুবাদক- সুবোধ চন্দ্র মজুমদার]
বরুণ
মহাভারতে (অনুশাসন পর্ব / ১৫৪)   বরুণদেবকে চন্দ্রের কন্যা উতথ্যের স্ত্রী ভদ্রার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে হরণ করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বরুণ যখন ভদ্রাকে ফিরিয়ে দিলেন না, উতথ্য তখন সমস্ত জলরাশি পান করতে উদ্যত হলে ,বরুণ ভয় পেয়ে ভদ্রাকে ফিরিয়ে দেন-

“বহুকাল পূর্বে বরুণ নারীটির প্রতি অভিলাষী হয়েছিলেন।উতথ্যের স্ত্রী যখন যমুনায় স্নান করতে যাচ্ছিলেন তখন  উতথ্য যে বনে বাস করতেন সেখানে উপস্থিত হয়ে বরুণ  তার স্ত্রীকে হরণ করেন। তাকে অপহরণ করে বরুণ তাকে তার ভবনে নিয়ে যান।… বরুণ তার সাথে বিহার করেন।…” [1]

সূর্য
ঘটনাটি কুন্তির বিবাহের আগের। কুন্তির সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা মুনি কুন্তিকে একটি মন্ত্র দিয়েছিলেন, যে মন্ত্রবলে দেবতাদের সঙ্গমের জন্য ডাকা যেত। মন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য কুন্তি মন্ত্রবলে সূর্যকে ডাকেন। সূর্যও সত্যি সত্যি মানুষের রূপ ধরে কুন্তির সামনে এসে উপস্থিত হন। অবিবাহিতা কুন্তি সূর্যকে দেখে ভয় পেয়ে যান এবং  তাকে ফিরে যেতে বলেন। সূর্য ফিরে যেতে সম্মত হন না বরং কুন্তিকে অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তার সাথে সহবাস করেন।

সূর্য কুন্তিকে বলেছিলেন, “ আমি যদি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাই তবে দেবতাদের নিকট হাসির বস্তুতে পরিণত হব। হে কুন্তি! তুমি যদি আমাকে সন্তুষ্ট না কর তবে আমি তোমাকে এবং যে ব্রাহ্মণ তোমাকে মন্ত্রটি দিয়েছে তাকে অভিশাপ দেব।“ [2]

এছাড়া সূর্য কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন যে সন্তান প্রসবের পরও কুন্তির কুমারিত্ব বজায় থাকবে।

ভয় দেখিয়ে নারী সহবাসকে ধর্ষণ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?

[দেবী ভাগবত ২/৬ ;অনুবাদক-স্বামী বিজ্ঞানানন্দ]
ইন্দ্র
সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা অহল্যা নামের এক অপরূপা নারীকে সৃষ্টি করেছিলেন। ‘অহল্যা’ শব্দের অর্থ হল ‘অনিন্দনীয়া’। ‘যার মধ্যে কোনো বিরূপতা নেই তিনিই অহল্যা’। এই জন্যেই ব্রহ্মা নারীটির ‘অহল্যা’ নামকরণ করেন। ‘অহল্যা কার পত্নী হবেন- এই নিয়ে স্রষ্টা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। দেবতাদের রাজা হওয়ার কারণে ইন্দ্র ভাবলেন, অহল্যা তারই পত্নী হবেন কিন্তু ব্রহ্মা অহল্যাকে গৌতম মুনির কাছে গচ্ছিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং বহুকাল পরে গৌতম অহল্যাকে পুনরায় ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন। গৌতমের সংযম দেখে ব্রহ্মা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং অহল্যাকে তার স্ত্রী করে দেন। অহল্যাকে গৌতমের স্ত্রী হতে দেখে দেবতারা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। এতে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র ভীষণ রেগে যান এবং গৌতমের আশ্রমে উপস্থিত হয়ে ক্রুদ্ধ ইন্দ্র অহল্যাকে দেখতে পান।

এর পর একই ঘটনার দুই ধরণের বিবরণ বাল্মীকির রামায়ণে পাওয়া যায়। একটি অনুসারে ইন্দ্র অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন। অপরটি অনুসারে অহল্যা ইন্দ্রের সাথে ব্যভিচারে রত হয়েছিলেন।

ইন্দ্রের অহল্যা ধর্ষণ প্রসঙ্গে ব্রহ্মা বলেন,

“ ইন্দ্র তুমি কামপীড়িত হইয়া অহল্যাকে বলাৎকার করিলে…”

অহল্যাকে ধর্ষণ করে পালানোর সময় ইন্দ্র গৌতমের কাছে ধরা পড়ে যান।ক্রুদ্ধ গৌতম ইন্দ্রকে দেখতে পেয়ে, কুপিত হয়ে ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন,

“ ইন্দ্র! তুমি নির্ভয় চিত্তে আমার পত্নীকে বলাৎকার করেছ। সুতরাং দেবরাজ ,তুমি যুদ্ধে শত্রুর হস্তগত হবে। দেবেন্দ্র! এইজন্যই তোমার দশা পরিবর্তন ঘটেছে। তুমি ইহলোকে যে ভাব প্রবর্তিত করলে, তোমার দোষে মনুষ্যলোকেও এই জারভাব প্রবর্তিত হবে, পাপের অর্ধেক অংশ তার হবে এবং পাপের অর্ধেক অংশ তোমাকে স্পর্শ করবে; আর তোমার স্থান স্থির থাকবে না, এতে সংশয় নাই। যিনি যিনি দেবতাদের রাজা হবেন তিনি স্থির থাকবেন না”

এরপর গৌতম তার পত্নী অহল্যাকে অতীব তিরস্কার করেন। গৌতম বলেন,

“ আমার আশ্রমের কাছে তুমি সৌন্দর্যহীনা হয়ে থাক। তুমি রূপবতী এবং যুবতী বলেই গর্বে অস্থির হয়েছ, বিশেষত এতদিন পর্যন্ত তুমি একাকিনীই ইহলোকে রূপবতী ছিলে, কিন্তু এখন আর তা হবে না, তোমার একত্রস্থিত রূপরাশি দেখেই ইন্দ্রের দেহবিকার জন্মেছে; সুতরাং তোমার রূপ প্রজামাত্রেই পাবে, সন্দেহ নাই।“

এই কথা শুনে অহল্যা বলেন,

“বিপ্রশ্রেষ্ঠ! স্বর্গবাসী ইন্দ্র তোমার রূপ ধরে অজ্ঞানবশত আমাকে বলাৎকার করেছে, বিশেষত আমার কামাচারবশত এটা সংঘটিত হয়নি”

[বাল্মীকি রামায়ণ/ উত্তর কাণ্ড/ ৩৫ সর্গ]
বিষ্ণু
পুরাণ অনুযায়ী,শঙ্খচূড় বরপ্রাপ্ত ছিল, যতক্ষণ অবধি তার পত্নী তুলসীর (তথাকথিত) সতীত্ব বজায় থাকবে, ততক্ষণ শঙ্খচূড় যুদ্ধে অপরাজেয় থাকবে। সুতরাং শঙ্খচূড়কে যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য ভগবান বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের রূপ ধরে শঙ্খচূড়ের পত্নী তুলসীকে ধর্ষণ করেন। তুলসীকে ধর্ষণ করার পর শঙ্খচূড়কে সহজেই হত্যা করা হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ভগবান বিষ্ণুর ধর্ষণ লীলা এইভাবে বর্ণিত আছে-

“কবচ গ্রহণ করি বিষ্ণু অতঃপর।

তুলসীর নিকটেতে চলিলা সত্ত্বর।।

শঙ্খচূড় রূপে সেথা করিয়া গমন।

তুলসীর সতীধর্ম করিলা হরণ।।

না জানিলা দৈত্যপত্নী কি পাপ হইল।

দেবতা ছলনা করি সতীত্ব নাশিল।।

যেইক্ষেত্রে বিষ্ণুদেব করিলা রমণ।

তুলসী উদরে বীর্য হইল পতন।।

সেইক্ষণে মহাদেব দৈববাণী শোনে।

শঙ্খচূড়ে বধ তুমি করহ এক্ষণে।।“

[ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ১৩৬ পৃষ্ঠা ,সুবোধচন্দ্র মজুমদারের অনুবাদ]
ভগবান বিষ্ণু বৃন্দা নামক এক নারীকেও ধর্ষণ করেন। স্কন্দপুরাণে ঘটনাটির উল্লেখ আছে। অসুরদের রাজা জলন্ধর  ক্রুদ্ধ হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিল। জলন্ধরের পরাক্রমে দেবতারা তার বশীভূত হয়েছিল।

এরপর একসময় শিবপত্নী পার্বতীর প্রতি মোহিত হয়ে  শিবের কাছ থেকে পার্বতীকে নিয়ে আসার জন্য জলন্ধর দূত প্রেরণ করে।  জলন্ধরের সেই ইচ্ছা পূরণ না হলে জলন্ধর বিশাল সৈন্য নিয়ে শিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করে। শিবের সাথে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে এক মায়ার দ্বারা শিবকে জলন্ধর বশীভূত করলে, শিবের হাত হতে সকল অস্ত্র পতিত হয়। এই সময়ে জলন্ধর কামার্ত হয়ে, শিবের রূপ ধারণ করে শিবপত্নী গৌরি যেখানে উপস্থিত ছিলেন সেখানে উপস্থিত হন। দূর থেকে পার্বতীকে দেখে জলন্ধরের বীর্য পতিত হয়। পার্বতীও শিবরূপী জলন্ধরকে চিনতে পেরে, সেখান থেকে পালিয়ে যান। জলন্ধরও শিবের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ফিরে আসেন।  এরপর, পার্বতী বিষ্ণুকে স্মরণ করতে থাকেন। পার্বতীর আহ্বানে বিষ্ণু উপস্থিত হলে পার্বতী তাকে বলেন,

” হে বিষ্ণু! দৈত্য জলন্ধর আজ এক পরম অদ্ভুত কর্ম করিয়াছে; তুমি কি সেই দুর্মতি দৈত্যের ব্যবহার বিদিত নহ?” [3]

বিষ্ণু উত্তর দেন,

” হে দেবী! জলন্ধরই পথ দেখাইয়াছে, আমরাও সেই পথের অনুসরণ করিব, ইহা না করিলে জলন্ধরও বধ হইবে না এবং আপনারও পাতিব্রাত্য রক্ষিত হইবে না।” [4]

“জলন্ধর যখন শিবের সাথে যুদ্ধে রত, তখন “বিষ্ণু দানবরাজপত্নী বৃন্দার পাতিব্রাত্য ভঙ্গ করিবার অভিলাষে বুদ্ধি করিলেন এবং তখনই জলন্ধরের রূপ ধারণ করিয়া, যথায় বৃন্দা অবস্থিত ছিলেন, সেই পুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন।” [5]

এইখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বৃন্দা হল জলন্ধরের স্ত্রী।

সেইসময়ে জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দা এক দুঃস্বপ্ন দেখে তার স্বামীর জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং এক ঋষির দেখা পায়। বৃন্দা সেই ঋষির কাছে জলন্ধরের অবস্থা জানতে চাইলে, মুনির আদেশে দুটি বানর জলন্ধরের মাথা ও ধর নিয়ে উপস্থিত হয়। তা দেখে বৃন্দা শোকগ্রস্ত হয়ে মূর্ছিত হয়ে  ভূমিতে পতিত হয়। পরে জ্ঞান ফিরলে জলন্ধরের স্ত্রী সেই ঋষির কাছে তার স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। তার অনুরোধে সেই ঋষি নিজে সেই স্থান হতে অদৃশ্য হয়ে যান এবং সাথে সাথেই বৃন্দা জীবিত জলন্ধরকে সেই স্থানে দেখতে পায়।

জলন্ধর জীবিত হয়ে, ” প্রীতিমান বৃন্দাকে আলিঙ্গন করিয়া তাহার গলদেশে চুম্বন করিল”। “অনন্তর বৃন্দাও স্বামীকে জীবিত দেখিতে পাইয়া সুখীমনে সেই কাননমধ্যে অবস্থিত হইয়া তাহার সহিত রতি করিতে লাগিল।” একদিন বৃন্দা জলন্ধররূপী বিষ্ণুকে চিনতে পারে। [6]

ক্রুদ্ধ হয়ে বৃন্দা বলে,

” হে হরে! তুমি পরদারগামিনী (অন্যের স্ত্রীকে সম্ভোগকারী), তোমার চরিত্রে ধিক!”  [7]

বিষ্ণুকে তীরস্কার করে, অভিশাপ দিয়ে , আত্মহত্যা করার জন্য বৃন্দা আগুনে প্রবেশ করে। “বৃন্দাসক্তমনা (বৃন্দার প্রতি আসক্ত) বিষ্ণু তাঁহাকে বারণ করিলেও তিনি তাহা শুনিলেন না। অনন্তর হরি বারবার তাঁহাকে স্মরণ পূর্বক দগ্ধদেহ বৃন্দার ভস্ম-রজো দ্বারা শরীর আবৃত করিয়া সেই স্থানেই অবস্থিত হইলেন, সুর ও সিদ্ধগণ তাঁহাকে সান্ত্বনা  দান করিলেও তিনি শান্তি লাভ করিলেন না।” [8]

রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাগধারা-

'খোদার খাসি’ - ভাবনাচিন্তাহীন।
আদিখ্যেতা’ -ন্যাকামি।
"ছকড়া নকড়া" -অবহেলা।
‘মাছরাঙার কলঙ্ক’ - অনেক অপরাধীর মধ্য কেবল একজনকে দোষী সাব্যস্ত করা।
“ক-অক্ষর গোমাংস” -অশিক্ষিত ব্যক্তি।
“বুদ্ধির ঢেঁকি” -নিরেট মূর্খ।
'ধর্মের ষাঁড়' -স্বার্থপর।
"বাঘের মাসি" -নির্ভীক।
“হাত ভারি” -কৃপণ।
“হাত জুড়ানো” -স্বস্তি লাভ করা।
"ঢাকের কাঠি" - -তোষামুদে।
"চোরের সাক্ষী গাঁট কাটা’- সামান্য কাজের সামান্য পাত্র।
‘ঊনকোটি চৌষট্টি’ -প্রায় সম্পুর্ণ।
‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ -বাপের চেয়ে ছেলের তেজ বেশি।
'ঢাক ঢাক গুড় গুড়'-গোপন রাখার চেষ্টা
'ঢেঁকির কচকচি' -বিরক্তিকর কথা।
'ঢাকের কাঠি' -চাটুকার।
'ঢি ঢি পড়া' বকলঙ্ক প্রচার হওয়া।
'ঢাকের বাঁয়া' -অপ্রয়োজনীয়।
'ঢিমে তেতালা' -মন্থর।
'ভূশণ্ডির কাক' -দীর্ঘজীবী।
'বামনের গরু' -অল্প পারিশ্রমিকে বেশি কাজ করা।
'বার মাস ত্রিশ দিন' -প্রতিদিন।
'নোনা জল ঢোকানো' -নিজেই নিজের ক্ষতি বা বিপদ ডেকে আনা।
'আলুর দোষ' -প্রেমে নাছড়বান্ধা বা প্রেমে প্রবল আকর্ষণ।
'নেপোই মারে দই' -ধূর্ত লোকের ফলপ্রাপ্তি।
"অজগর বৃত্তি" -আলসেমি।
'ত্রিশঙ্কুদশা' -দুটানা অবস্থা।
"জুতো সেলায় থেকে চণ্ডীপাঠ" -ছোট বড় যাবতীয় কাজ করা।
'কচুবনের কালাচাঁদ' - অপদার্থ
'ভিটায় ঘুঘু চড়ানো' - সর্বস্বান্ত করা।
'তাল ঠেকা' - সগর্ব উক্তি।
'পায়াভারি' - অহংকার।
'হাতে দূর্বা গজানো' -আলসেমির লক্ষন।
'সাপের পাঁচ পা দেখা' - অহংকারে অসম্ভবকে সম্ভব মনে করা।
'শিকায় তোলা' -মূলতবি রাখা।
'উলুখাগড়া' -তুচ্ছ ব্যক্তি।
'ঢাক গুড়গুড়' - লুকোচুরি।
'রাবণের চিতা'- চির অশান্তি।
'চাঁদের হাট' - প্রিয়জন সমাগম।
'সাক্ষী গোপাল'- নিষ্ক্রিয় দর্শক।
'চোখের বালি' - অপ্রিয় ব্যক্তি।
'দুধের মাছি' - সুসময়ের বন্ধু।
'নিরানব্বইয়ের ধাক্কা' - সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি।

রবিবার, ১৭ মে, ২০২০

সব কিছু নষ্টদের দখলে-

তিনি মারা গেলেন সকাল আটটায়.....

আগের রাতে শেরাটনে 'ধর্মীয় গোঁড়ামি অপসারণে মুক্তচিন্তার ভূমিকা' শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রেখেছিলেন। বলেছিলেন, এদেশে উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা ইসলাম।  কাঠমোল্লাদের জন্যই দেশ আজো কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। অনেক বছর আগেই আমি ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সরে এসেছি। 

সকাল নটায় তাকে পাওয়া গেলো তার বেডরুমে, মৃত।
১০ টার খবরে প্রচার হলো তার মৃত্যুসংবাদ। সাড়া পড়ে গেলো বামপাড়া ও রামপাড়ায়।

তার ইস্কাটনের বাসায় এলেন বুদ্ধিজীবীরা। ড্রয়িংরুমে বড় করে বাঁধানো তার হাস্যোজ্জ্বল ছবির নিচে বসে সাক্ষাতকার দিলেন তারা। তারা জানালেন, দেশ আজ আপোষহীন এক মুক্তমনা যোদ্ধাকে হারিয়েছে। চুরুট টানতে টানতে একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক বললেন, তিনি ধর্ম ও ধার্মিকতার সকল কুসংস্কার থেকে মুক্ত ছিলেন। দেশের উন্নতির জন্য আমাদেরও সে পথে হাঁটতে হবে। করতালিতে চাপা পড়ে গেল অধ্যাপকের কথা, সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্লাশ প্রতিফলিত হলো তার মোটা ফ্রেমের চশমায়।

তার মৃত্যুতে শোকাহত হলেন অনেকেই, ইউরোপ থেকে দুজন ব্লগার টুইটারে শোকবার্তা লিখলেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবিরাও সাক্ষাতকার দিতে ছুটলেন আনন্দবাজারের অফিসে।
ঘুরে ফিরে একই কথা বললেন সবাই, তিনি ছিলেন এক জ্ঞানসাধক। জ্ঞানের রাজ্যে ছিল তার অবাধ বিচরণ।

দুষ্টলোকরা অবশ্য উসকানি দিয়ে বললো, যে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সে তার রবকে চিনতে পারেনি, সেই জ্ঞান কোনো জ্ঞানই  নয়।
-
গোসল ও কাফন পরানো শেষে লাশ নিয়ে আসা হলো শহীদ মিনারে। ফুল দিয়ে কফিনকে বরন করে নিল সবাই। সবকটা চ্যানেলে একযোগে দেখালো সে দৃশ্য।

শহীদ মিনারে রাখা তার লাশের কফিন। শরীরে সাদা কাফন পড়ানো। বুদ্ধিজীবীরা ফুল দিয়ে গেল। কেউ কোনো  প্রতিবাদ জানালো না। কেউ বললো না, খুলে ফেলো কাফনের কাপড়, কারণ 'অসাম্প্রদায়িক' শরীরে 'সাম্প্রদায়িক' পোষাক মানায় না।
জানাজা হলো শেষ বিকেলে। সরকারি মসজিদের এক ইমাম চাকরি বাঁচাতে জানাজা পড়াতে রাজি হলেন। বেচারার মুখটা ছিল ফ্যাকাশে, বাধ্য না হলে হয়তো কাজটা করতো না সে।

জানাজায় যারা এলো, কারোই অজু ছিলো না। দুয়েকজন অবশ্য সতর্কতা হিসেবে দুই হাত পানিতে চুবিয়ে নিল। পেছনের কাতারে দুয়েকজন হিন্দু দাদাও ছিল। সর্বধর্ম বলে একটা কথা আছে কত্তা, এই বলে হে হে করে হাসলেন তারা। জানাজার দৃশ্যটা অদ্ভুত দেখালো, কেউ কেউ ডান হাতের উপর বাম হাত বেধে উদাস নয়নে তাকিয়ে রইলেন আসমানের দিকে, কেউ লাইভ প্রচার করা ক্যামেরাগুলোর দিকে, বুদ্ধিমানরা অত ঝামেলায় গেলেন না, দু’হাত খুলে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনেই ব্যস্ত হলেন।

জানাজা শেষে, লাশ এলো বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে। জীবনে যাদের সাথে ছিলেন, মরনেও তাদের সাথে রাখার সুন্দর ব্যবস্থা আছে এখানে। দুষ্টলোকরা অবশ্য বলে, আজাবের ফেরেশতার সুবিধা হয় এতে। পালের গোদা সবগুলোকে একসাথে পাওয়া যায় এখানে।

মাটিতে নামানো হলো লাশ। সম্মান দেখিয়ে একুশবার ফাঁকা গুলির শব্দ করা হলো। ভয়ে পেয়ে দুটো ঘুঘো গাছের ডাল ছেড়ে উড়াল দিলো। কেউ একজন অশুদ্ধ উচ্চারণে পড়লেন, বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহ। এভাবে মৃত ব্যক্তিটির সাথে চরম গাদ্দারি করলো তার জীবিত বন্ধুরা।

লাশ রাখা শেষে মাটি চাপা দেয়া হল।
সারা জীবন কটাক্ষ করেছেন ধর্মকে, শত্রু ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার। ভালো লাগেনি মদীনার নবীর কথা।

কিন্তু এখন, মদীনার নবীর শেখানো পদ্ধতিতে, যাত্রা করলেন অসীম অনন্তে। অবাক করা ব্যাপার হলো, তার বন্ধু ও সহকর্মীদের মনেও এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন দেখা দিল না। তারাও ধরে নিয়েছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক কিছু।

সেদিন সন্ধ্যায় তার বিলাসবহুল বাড়ির সামনে জ্বালানো হলো ৮৪ টি মোমবাতি।

৮৪ বছর বেঁচে ছিলেন একথা বুঝাতে। দুষ্টলোকরা অবশ্য বললো, ‘কবরে আগুন জ্বলছে, তাই বারান্দায় ঝোলানো তার ছবির নিচেও মোমবাতির আগুন’।

একথা শুনে সদ্য করোনা থেকে ফিরে আসা এক অধ্যাপক বিরস বদনে বললেন, হুহ, একদিন সবকিছু নষ্টদের দখলে যাবে।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০

নজরুলের ইসলামি সংগীত।

শ্যামা সঙ্গীতের রেকর্ডিং শেষে কাজী নজরুল ইসলাম বাড়ি ফিরছেন। যাত্রাপথে তাঁর পথ আগলে ধরেন সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীন। একটা আবদার নিয়ে এসেছেন তিনি। আবদারটি না শোনা পর্যন্ত নজরুলকে তিনি এগুতে দিবেন না।

আব্বাস উদ্দীন নজরুলকে সম্মান করেন, সমীহ করে চলেন। নজরুলকে তিনি ‘কাজীদা’ বলে ডাকেন। নজরুল বললেন, “বলে ফেলো তোমার আবদার।”

আব্বাস উদ্দীন সুযোগটা পেয়ে গেলেন। বললেন, “কাজীদা, একটা কথা আপনাকে বলবো বলবো ভাবছি। দেখুন না, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালী গায়। শুনেছি এদের গান অসম্ভব রকমের বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গেলে হয় না? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান হবে।”

বাজারে তখন ট্রেন্ড চলছিলো শ্যামা সঙ্গীতের। শ্যামা সঙ্গীত গেয়ে সবাই রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। এই স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে অনেক মুসলিম শিল্পী হিন্দু নাম ধারণ করেন। মুনশী মোহাম্মদ কাসেম হয়ে যান ‘কে. মল্লিক’, তালাত মাহমুদ হয়ে যান ‘তপন কুমার’। মুসলিম নামে হিন্দু সঙ্গীত গাইলে গান চলবে না। নজরুল নিজেও শ্যামা সঙ্গীত লেখেন, সুর দেন।

গানের বাজারের যখন এই অবস্থা তখন আব্বাস উদ্দীনের এমন আবদারের জবাবে নজরুল কী উত্তর দেবেন? ‘ইসলাম’ শব্দটার সাথে তো তাঁর কতো আবেগ মিশে আছে। ছোটবেলায় মক্তবে পড়েছেন, কুর’আন শিখেছেন এমনকি তাঁর নিজের নামের সাথেও তো ‘ইসলাম’ আছে।

আব্বাস উদ্দীনকে তো এই মুহূর্তে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলা যাচ্ছে না। স্রোতের বিপরীতে সুর মেলানো চট্টিখানি কথা না। আবেগে গা ভাসালে চলবে না। গান রেকর্ড করতে হলে তো বিনিয়োগ করতে হবে, সরঞ্জাম লাগবে। এগুলোর জন্য আবার ভগবতী বাবুর কাছে যেতে হবে। ভগবতী বাবু হলেন গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জ।

নজরুল বললেন, “আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজী করাতে পারো কিনা।” আব্বাস উদ্দীন ভাবলেন, এইতো, কাজীদার কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলাম, ভগবতী বাবুকে কিভাবে রাজী করাতে হয় সেটা এখন দেখবেন।

গ্রামোফোনের রিহার্সেল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবুর কাছে গিয়ে আব্বাস উদ্দীন অনুরোধ করলেন। কিন্তু, ভগবতী বাবু ঝুঁকি নিতে রাজী না। মার্কেট ট্রেন্ডের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে পারে। আব্বাস উদ্দীন খান যতোই তাঁকে অনুরোধ করছেন, ততোই তিনি বেঁকে বসছেন। ঐদিকে আব্বাস উদ্দীনও নাছোড়বান্দা। এতো বড় সুরকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভগবতী বাবুর পিছু ছাড়ছেন না। অনুরোধ করেই যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয়মাস চললো অনুরোধ প্রয়াস। এ যেন পাথরে ফুল ফুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা!

একদিন ভগবতী বাবুকে ফুরফুরে মেজাজে দেখে আব্বাস উদ্দীন বললেন, “একবার এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন না, যদি বিক্রি না হয় তাহলে আর নেবেন না। ক্ষতি কী?” ভগবতী বাবু আর কতো ‘না’ বলবেন। এবার হেসে বললেন, “নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি। আচ্ছা যান, করা যাবে। গান নিয়ে আসুন।” আব্বাস উদ্দীনের খুশিতে চোখে পানি আসার উপক্রম! যাক, সবাই রাজী। এবার একটা গান নিয়ে আসতে হবে।

নজরুল চা আর পান পছন্দ করেন। এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে আব্বাস উদ্দীন নজরুলের রুমে গেলেন। পান মুখে নজরুল খাতা কলম হাতে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে পড়লেন। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাস উদ্দীন খান অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো সময় যেন থমকে আছে। সময় কাটানোর জন্য আব্বাস উদ্দীন পায়চারী করতে লাগলেন।

প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেলো। বন্ধ দরজা খুলে নজরুল বের হলেন। পানের পিক ফেলে আব্বাস উদ্দীনের হাতে একটা কাগজ দিলেন। এই কাগজ তাঁর আধ ঘন্টার সাধনা। আব্বাস উদ্দীন খানের ছয় মাসের পরিশ্রমের ফল।

আব্বাস উদ্দীন খান কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেনঃ-

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।”

আব্বাস উদ্দীনের চোখ পানিতে ছলছল করছে। একটা গানের জন্য কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে। সেই গানটি এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি কি জানতেন, তাঁর হাতে বন্দী গানটি একদিন বাংলার ইথারে ইথারে পৌঁছে যাবে? ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে টিভিতে ভেজে উঠবে- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে...?

...

দুই মাস পর রোজার ঈদ। গান লেখার চারদিনের মধ্যে গানের রেকর্ডিং শুরু হয়ে গেলো। আব্বাস উদ্দীন খান জীবনে এর আগে কখনো ইসলামি গান রেকর্ড করেননি। গানটি তাঁর মুখস্তও হয়নি এখনো। গানটা চলবে কিনা এই নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি শঙ্কায় আছে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম বেশ এক্সাইটেড। কিভাবে সুর দিতে হবে দেখিয়ে দিলেন।

হারমোনিয়ামের উপর আব্বাস উদ্দীনের চোখ বরাবর কাগজটি ধরে রাখলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই। সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত কণ্ঠ থেকে বের হলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...”। ঈদের সময় গানের এ্যালবাম বাজারে আসবে। আপাতত সবাই ঈদের ছুটিতে।

রমজানের রোজার পর ঈদ এলো। আব্বাস উদ্দীন বাড়িতে ঈদ কাটালেন। কখন কলকাতায় যাবেন এই চিন্তায় তাঁর তর সইছে না। গানের কী অবস্থা তিনি জানেন না। তাড়াতাড়ি ছুটি কাটিয়ে কলকাতায় ফিরলেন।

ঈদের ছুটির পর প্রথমবারের মতো অফিসে যাচ্ছেন। ট্রামে চড়ে অফিসের পথে যতো এগুচ্ছেন, বুকটা ততো ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক করছে। অফিসে গিয়ে কী দেখবেন? গানটা ফ্লপ হয়েছে? গানটা যদি ফ্লপ হয় তাহলে তো আর জীবনেও ইসলামি গানের কথা ভগবতী বাবুকে বলতে পারবেন না। ভগবতী বাবু কেন, কোনো গ্রামোফোন কোম্পানি আর রিস্ক নিতে রাজী হবে না। সুযোগ একবারই আসে।

আব্বাস উদ্দীন যখন এই চিন্তায় মগ্ন, তখন পাশে বসা এক যুবক গুনগুনিয়ে গাওয়া শুরু করলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এই যুবক গানটি কোথায় শুনলো? নাকি আব্বাস উদ্দীন খান ভুল শুনছেন?

না তো। তিনি আবারো শুনলেন যুবকটি ঐ গানই গাচ্ছে। এবার তাঁর মনের মধ্যে এক শীতল বাতাস বয়ে গেলো। অফিস ফিরে বিকেলে যখন গড়ের মাঠে গেলেন তখন আরেকটা দৃশ্য দেখে এবার দ্বিগুণ অবাক হলেন। কয়েকটা ছেলে দলবেঁধে মাঠে বসে আছে। তারমধ্য থেকে একটা ছেলে গেয়ে উঠলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। আব্বাস উদ্দীন এতো আনন্দ একা সইতে পারলেন না। তাঁর সুখব্যথা হচ্ছে।

ছুটে চললেন নজরুলের কাছে। গিয়ে দেখলেন নজরুল দাবা খেলছেন। তিনি দাবা খেলা শুরু করলে দুনিয়া ভুলে যান। আশেপাশে কী হচ্ছে তার কোনো খেয়াল থাকে না। অথচ আজ আব্বাস উদ্দীনের গলার স্বর শুনার সাথে সাথে নজরুল দাবা খেলা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। নজরুল বললেন, “আব্বাস, তোমার গান কী যে হিট হয়েছে!”

অল্প কয়দিনের মধ্যেই গানটির হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়। ভগবতী বাবুও দারুণ খুশি। একসময় তিনি ইসলামি সঙ্গীতের প্রস্তাবে একবাক্যে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন, আজ তিনিই নজরুল-আব্বাসকে বলছেন, “এবার আরো কয়েকটি ইসলামি গান গাও না!” শুরু হলো নজরুলের রচনায় আর আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের জাগরণ।

বাজারে এবার নতুন ট্রেন্ড শুরু হলো ইসলামি সঙ্গীতের। এই ট্রেন্ড শুধু মুসলমানকেই স্পর্শ করেনি, স্পর্শ করেছে হিন্দু শিল্পীদেরও।

একসময় মুসলিম শিল্পীরা শ্যামা সঙ্গীত গাইবার জন্য নাম পরিবর্তন করে হিন্দু নাম রাখতেন। এবার হিন্দু শিল্পীরা ইসলামি সঙ্গীত গাবার জন্য মুসলিম নাম রাখা শুরু করলেন। ধীরেন দাস হয়ে যান গণি মিয়া, চিত্ত রায় হয়ে যান দেলোয়ার হোসেন, গিরিন চক্রবর্তী হয়ে যান সোনা মিয়া, হরিমতি হয়ে যান সাকিনা বেগম, সীতা দেবী হয়ে যান দুলি বিবি, ঊষারাণী হয়ে যান রওশন আরা বেগম।

তবে বিখ্যাত অনেক হিন্দু শিল্পী স্ব-নামেও নজরুলের ইসলামি সঙ্গীত গেয়েছেন। যেমনঃ অজয় রায়, ড. অনুপ ঘোষল, আশা ভোঁসলে, মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায়।

দুই.

কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গান লেখার সহজাত প্রতিভা ছিলো। খাতা কলম দিয়ে যদি কেউ বলতো, একটা গান লিখুন, তিনি লিখে ফেলতেন।

একদিন আব্বাস উদ্দীন নজরুলের বাড়িতে গেলেন। নজরুল তখন কী একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আব্বাস উদ্দীনকে হাতের ইশারায় বসতে বলে আবার লেখা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে যুহরের আযান মসজিদ থেকে ভেসে আসলো। আব্বাস উদ্দীন বললেন, “আমি নামাজ পড়বো। আর শুনুন কাজীদা, আপনার কাছে একটা গজলের জন্য আসছি।”

কবি শিল্পীকে একটা পরিস্কার জায়নামাজ দিয়ে বললেন, “আগে নামাজটা পড়ে নিন।” আব্বাস উদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন আর নজরুল খাতার মধ্যে কলম চালাতে শুরু করলেন।

আব্বাস উদ্দীনের নামাজ শেষ হলে নজরুল তাঁর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিন আপনার গজল!” হাতে কাগজটি নিয়ে তো আব্বাস উদ্দীনের চক্ষু চড়কগাছ। এই অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল গজল লিখে ফেলছেন? তা-ও আবার তাঁর নামাজ পড়ার দৃশ্যপট নিয়ে?

“হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ,
দিলাম তোমার চরণতলে হৃদয় জায়নামাজ।”

তিন.

কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর রচিত নাতে রাসূলের জন্য।

১। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়’

২। ‘মুহাম্মদ নাম জপেছিলি, বুলবুলি তুই আগে,
তাই কি রে তোর কন্ঠের গান, এমন মধুর লাগে।'

৩। ‘আমি যদি আরব হতাম মদীনারই পথ
আমার বুকে হেঁটে যেতেন, নূরনবী হজরত’

৪। ‘হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে যায়।
সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা।’

..

গানগুলো ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। গানগুলো রচনার প্রায় নব্বই বছর হয়ে গেছে। আজও মানুষ গুনগুনিয়ে গানগুলো গায়।

বাংলায় ইসলামি গানের যে নবজাগরণ নজরুল সূচনা করেছিলেন, যে পথ দেখিয়েছেন, পরবর্তীতে সেই পথের পথিক হয়েছেন জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, গোলাম মুহাম্মদ, মতিউর রহমান মল্লিক এবং হাল আমলের কবি মুহিব খান।

তথ্য উৎসঃ

১। আব্বাসউদ্দীনের আত্মজীবনী - ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা'।

২। Roar Media, বাংলা ইসলামি গান ও কাজী নজরুল ইসলাম।

৩। যুগান্তর, 'নজরুল এবং ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে', শামস আরেফিন।

৪। যুগান্তর, 'হামদ-নাতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন নজরুল', আদিল মাহমুদ।

৫। Risingbd, সুরের আকাশে উজ্জল নক্ষত্র আব্বাসউদ্দীন।

৬। সিলেট টুডে টুয়েন্টি-ফোর, মানবতাবাদী নজরুল থেকে ইসলামি কবি বিলকুল।
সংগৃহীত -
লিখেছেনঃ আরিফুল ইসলাম।

একুশের আক্ষেপানুরাগ

বেশ কয়েক বছর থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারির অঙ্গীকার ছিল অফিস আদালতে শতভাগ বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিদেশী ভাষার ব্যবহার কমানো, ব্যানার, ফেস...