বুধবার, ১৯ জুলাই, ২০১৭

সোনার_বাংলার_আদিকথা। এসো সবাই জেনে নিই।

"হিন্দু কবি সাহিত্যিকগণ মুসলমানদের ম্লেচ্ছ, যবন, নেড়ে, পাষন্ড, পাপিষ্ঠ, পাপাত্মা, দুরাত্মা, দুরাশয়, নরাধম, নরপিশাচ, পাতকী, বানর, এঁড়ে, দেড়ে, ধেড়ে, অজ্ঞান, অকৃতজ্ঞ, ইতর এ জাতীয় কোনো গালি দিতে কার্পণ্য করেনি। বঙ্কিম চন্দ্রের ‘মৃণালীনী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘রাজ সিংহ’ ও ‘কবিতা পুস্তক’, ইশ্বর গুপ্তের ‘কবিতা সংগ্রহ’ দামোদর মুখোপাধ্যয়ের ‘প্রতাপসিংহ’ যজ্ঞেশ্বর মুখোপাধ্যয়ের বঙ্গানুবাদিত ‘রাজস্থান’ দীন বন্ধু মিত্রের ‘জামাই বারিক’ ইত্যাদি ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৯০৩ খ্রি.) কাব্যসজ্জায় সুস্পষ্ট মুসলমান বিদ্বেষ পাওয়া যায় ।

"হেমচন্দ্র তাঁর বীরবাহুতে (১৮৬৪ খ্রি.) লিখেছে – আরে রে নিষ্ঠুর জাতি পাষণ্ড বর্বর পুরাব যবন-রক্তে শমন-খর্পর’। [ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আধুনিক বাংলা কাব্যে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক,  প্রথম প্রকাশ, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৭০]।

"বহু কাল থেকেই বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও চরম বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন মুসলমানরা। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮২৭-৮৭ খ্রি.) পদ্মিনী উপাখ্যানে (১৮৫৮ খ্রি.) স্বাধীনতার কামনা, পরাধীনতার বেদনা, দেশপ্রীতি এবং বিদেশাগত মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৭৯ তে প্রকাশিত অশ্রুমতী নাটক উৎসর্গ করেন অনুজ রবীন্দ্রনাথকে। এবং উক্ত নাটক ছিল মুসলিম বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। উক্ত নাটকের সৈন্যগণ বলছে, “আজ আমরা যুদ্ধে প্রাণ দেব, চিতোরের গৌরব রক্ষা করব, মুসলমান রক্তে আমাদের অসির জ্বলন্ত পিপাসা শান্ত করব”… (অশ্রুমতী : জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটক সমগ্র, সাহিত্য সংসদ,২০০২, পৃষ্ঠা ১১৩।)]।

"ইংরেজদের সাথে যুদ্ধরত মুসলমানদের মৃত্যুতে খুশী হয়ে ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত রচনা করেছিলেন;

একেবারে মারা যায় যত চাঁপদেড়ে (দাড়িওয়ালা)

হাঁসফাঁস করে যত প্যাঁজ (পিঁয়াজ) খোর নেড়ে

বিশেষত: পাকা দাড়ি পেট মোটাভূড়ে

রোদ্র গিয়া পেটে ঢোকে নেড়া মাথা ফূড়ে

কাজি কোল্লা মিয়া মোল্লা দাঁড়িপাল্লা ধরি

কাছা খোল্লা তোবাতাল্লা বলে আল্লা মরি

এই কবিতায় চরম মুসলিম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে। শুধু তাই নয় ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত স্পষ্টতই ব্রিটিশদের দালাল ছিলেন। তাইতো তিনি লিখেছিলেনঃ
'ভারতের প্রিয় পুত্র হিন্দু সমুদয়
মুক্তমুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়!  (দিল্লীর যুদ্ধ : গ্রন্থাবলী,পৃ. ১৯১)।]

"বঙ্কিমচন্দ্র তার শেখা প্রায় সবকটি গালি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করেছে। ‘ম্লেচ্ছ’ হতে শুরু করে ‘যবন’ পর্যন্ত। এমনকি প্রাচীনকালে বৌদ্ধদের দেয়া ‘নেড়ে’ গালিটাকেও সে দিতে বাদ রাখেনি। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দ মঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসে এক মন্তব্যে বলেন, ‘‘ধর্ম গেল, জাত গেল, মান গেল, কূল গেল, এখনতো প্রাণ পর্যন্ত যায়। এ নেড়েদের (মুসলমানদের) না তাড়াইলে আর কি হিন্দুয়ানি থাকে’’। এমনকি গল্পের মাধ্যমে মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার ইচ্ছাও প্রকাশ পেয়েছে এ উপন্যাসে; “ভাই, এমন দিন কি হইবে, মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধা মাধবের মন্দির গড়িব?” [আনন্দমঠ, তৃতীয় খন্ড, অষ্টম পরিচ্

"শুধু তাই নয়, “তিনি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ দানেশ খাঁকে দিয়ে মুসলমানদেরকে ‘শুয়ার’ বলে গালি দিয়েছেন। ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে কতিপয় স্ত্রীলোককে দিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মুখে লাথি মারার ব্যবস্থা করেছেন। ‘মৃণালিনী’তে বখতিয়ার খিলজীকে ‘অরণ্য নর’ বলেছেন। কবিতা পুস্তকে তিনি লিখেছেন, ‘‘আসে আসুক না আরবী বানর – আসে আসুক না পারসী পামর’’। (আফজাল চৌধুরীর শেষ কবিতা: মুকুল চৌধুরী, দৈনিক সংগ্রাম,ঈদসংখ্যা-২০১২)।

"রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন, ‘মুসলমানরা একমাত্র বেয়াদব যাহারা হিন্দু পরিচয় স্বীকার করিবে না’। (বণিক বার্তা)

"রবীন্দ্রনাথ তার ‘রীতিমত নভেল’ নামক ছোটগল্পে মুসলিম চরিত্র হরণ করেছে এভাবে-ঃ
'আল্লা হো আকবর’ শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। হর হর বোম্‌ বোম্‌! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া  পতিত  হইল?  বলিতে  পার,  কাহার  প্রতাপে  এই অগণিত  যবনসৈন্য  প্রচণ্ড  বাত্যাহত অরণ্যানীর  ন্যায়  বিক্ষুব্ধ  হইয়া  উঠিল?—  কাহার বজ্রমন্দ্রিত  ‘হর  হর  বোম্‌  বোম্‌’ শব্দে  তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের  ‘আল্লা  হো  আকবর’   ধ্বনি  নিমগ্ন  হইয়া  গেল? ইনিই সেই ললিতসিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র। (যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা, পৃষ্ঠা ৫৬)
             
"ঐ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমানদের পাণ্ডা বলে সম্ভোদন করেন। বলেন; “হিন্দুস্থান হিন্দুর দেশ। হিন্দু-মুসলমান-মিলন একটা গালভরা শব্দ। বস্তুতঃ, মুসলমান যদি কখনও বলে—হিন্দুর সহিত মিলন করিতে চাই, সে যে ছলনা ছাড়া আর কি হইতে পারে, ভাবিয়া পাওয়া কঠিন। একদিন মুসলমান লুণ্ঠনের জন্যই ভারতে প্রবেশ করিয়াছিল, রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য আসে নাই। সেদিন কেবল লুঠ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, মন্দির ধ্বংস করিয়াছে, প্রতিমা চূর্ণ করিয়াছে, নারীর সতীত্ব হানি করিয়াছে, বস্তুতঃ অপরের ধর্ম ও মনুষ্যত্বের উপরে যতখানি আঘাত ও অপমান করা যায়, কোথাও কোন সঙ্কোচ মানে নাই।” (বিস্তারিত দেখুনঃ হিন্দু-মুসলমান সমস্যাঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক চেহারা– সম্পাদক) ]

"কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেহেতু বিশ্ব কবি, একটি স্বতন্ত্র পর্ব লিখে এই বিষয়ে ইতি টানার  আশা পোষণ করছি। তথ্যসংগ্রহ করা এবং আঙুল টিপে লিখা আমার জন্য একটু সাধ্য ব্যাপার..! তারপর..শুধু আপনাদের সহযোগিতা কাম্য!
চলবে.........  ইনশাহ আল্লাহ।

তুমি পুরুষ, তোমাকে পারতেই হবে!

তুমি পুরুষ। তোমাকে মানুষ কষ্ট দেবে, তুমি কষ্ট পাবে; ভেঙে-চুড়ে একাকার হয়ে যাবে... ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে। আশেপাশে কাউকেই পাবে না। তবুও তোমাকে সকালের সূর্য্যটা দেখতেই হবে। তোমাকে মানুষ মারবে। তুমি মারও খাবে। কেটে-কুটে যাওয়া জায়গাগুলোতে তোমাকেই ড্রেজিং করে নিতে হবে। আবার তোমাকে পাল্টা মার দিতেও হবে!

তোমার দুই পায়ের উপর এখন তোমার নিজের শরীরের ভার নিয়ে চলো। কিন্তু কাল তোমাকে নিজের সাথে তোমার ফ্যামিলির ভার নিতে হবে। পরশু তোমাকে তোমার বউয়ের ভারটাও নিতে হবে। সেই দুই পায়েই অনেক মানুষের ভার নিয়ে তোমাকে মাইলের পর মাইল চলতে হবে। কিন্তু তবুও তোমাকে একটুও টলকানো চলবে না!

সাঁতার জানো না সত্ত্বেও কেউ তোমাকে নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। তুমি আঁকড়ে ধরার মত কিছুই পাবে না। তবুও নদীতে খাবি খাওয়ার সময়টুকুর মধ্যেই তোমাকে সাঁতার রপ্ত করে তীরে ফিরতেই হবে।

নিজের প্রচন্ড জ্বর থাকা সত্ত্বেও, মাঝরাতে নিজের অন্তঃসত্তা বউকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ানোর ক্ষমতাও তোমার থাকতে হবে। একহাতে তোমাকে ক্যারিয়ার নিয়ে এগোতে হবে, আরেক হাতে প্রিয়তমাকেও সময় দিতে হবে এবং আরেক হাতেও তোমাকে করে যেতে হবে পরবর্তী দিনের কর্ম পরিকল্পনা।

সারাদিন তুমি খাটবে, আবার সারারাত তুমি কষ্টে জর্জরিত হয়ে কেঁদে বালিশ ভেজাবে। কিন্তু তবুও, না ঘুমিয়ে হলেও পরের সকালে ঠিক সময়ে তোমাকে কর্মস্থলে পৌছাতেই হবে। তোমাকে সবকিছুই পারতেই হবে এবং বিশ্বাস করো... তুমি পারবে। কারণ, তুমি পুরুষ!

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ কাদের স্বার্থে?


ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ শব্দটি মূলত ইংরেজি সেক্যুলারিজম শব্দের বাংলা অনুবাদ। Secularism-এর অভিধানগত অর্থ হল নৈতিকতা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় এই মতবাদ (তথ্য সূত্র-Bangla Academy)। লন্ডন থেকে প্রকাশিত কেমব্রিজ ডিকশনারিতে Secularism সম্পর্কে বলা হয়েছে, The believer that religion should not be involved with the ordinary social and political activities of country. অর্থাৎ একটি দেশের সাধারণত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর প্রভাব থাকবে না এমন একটি ধর্মের বিশ্বাস। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মীয় প্রবণতা বা ধর্মীয় বিধিবিধান মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ জীবনের সকল শাখা-প্রশাখায় তথা মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ সকল শাখা থেকে আল্লাহ ও রাসূলের বিধান বাদ দেয়ার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই এ মতবাদের উৎপত্তি, প্রকৃত রূপ ও পরিণাম ও বৈধতা সম্পর্কে তথ্য ও যুক্তি ভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন। ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন। ইউরোপের একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর উদ্ভব। সেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে না রেখে শুধু শব্দটির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর অর্থ ব্যাখ্যার প্রয়াস গ্রহণ করতে অনেক বই দেখা যাচ্ছে। এমনকি অনেক বিজ্ঞ কলামিস্ট ও আলেম-ওলামা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের তাৎপর্য না বুঝেই এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত পেশ করছেন। এ ধরনের প্রেক্ষিতে যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনের উদ্ভব তা আমাদেরও জানা প্রয়োজন। গত ২৫০ বছর থেকে এটা পৃথিবীর সত্য একটি আদর্শের মর্যাদা লাভ করেছে। দার্শনিকদের মধ্যে দান্তে (জন্ম ১২৬৫ মৃত্যু ১৩২১ খ্রি.) তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রবক্তা। তিনি বলেন, মানবজীবনের দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাই দুজন পথপ্রদর্শক, দুটি আলোকবর্তিকা শাশ্বত জীবনের শুভ পথ দেখাবেন পোপ ধর্মগ্রন্থের দিব্যাজ্ঞানের মশাল হাতে নিয়ে। আর পার্থিব সুখের পথপ্রদর্শক হবেন স্রষ্টা। তার যৌক্তিক ও দার্শনিক পসরা হাতে নিয়ে। পরবর্তী সময়ে দার্শনিক মরসিলিও (জন্ম ১২৭৪ মৃত্যু ১৩৪৩) এতে চার্চের ওপর রাষ্ট্রে শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করলেন এবং ধর্মকে জীবনের আজ্ঞিনা থেকে হটিয়ে কেবল পারলৌকিক মুক্তির পরিমন্ডলে আবাদ করলেন। তিনি বলতেন, যাভ্যবাদের মূল কথা হল পরকালের উন্নত জীবনের নিশ্চয়তার আশ্বাস। আর রাষ্ট্রের কাজ হলো উন্নত জীবন সংগঠন এবং তা শুধু ইহকালের নয় পরকালের। আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের জনক বলা হয় যাকে তিনি হলেন ম্যাকিয়াভেলি। তিনি ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে ইটালির ফ্লোরেন্স নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ধর্মে অবিশ্বাসী। আমেরিকায় মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলন ‘আপোষ আন্দোলন' নামে খ্যাত। এ আন্দোলনের মূল নীতি হলো ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকুক এবং মানুষের ধর্মীয় দিকের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চার্চের হতে থাকুক। কিন্তু, সমাজের পার্থিব জীবনের সকল কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং পার্থিব কোনো বিষয়ে চার্চের কোনো প্রাধান্য থাকবে না। তবে অবশ্যই রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে চার্চের নিকটই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবার সময় শপথ গ্রহণ করতে হবে। এবার আসুন ধর্মনিরপেক্ষতার পরিণাম কি হল? মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম কামাল পাশাই এ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্ক পাশা আধুনিক তুরস্ক গড়ার নামে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। ফলে এ মতবাদের নিয়ম অনুসারে মসজিদে মাইকে আযান দেয়া, জামায়াতে নামাজ আদায় করা, আরবি ভাষা শিক্ষা করা, কুরআন শরীফ শিক্ষা করা, মাহফিল করা, কুরবানী করা, ঈদের নামায আদায় করা, বোরকা পরা, মাথায় ওড়না পরিধান করাসহ সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করেও দেয়া হয়েছে। এটাই কি ধর্মীয় ব্যক্তি স্বাধীনতা? এরপর তুরস্কে মুসলিম সরকার ক্ষমতার মসনদে অসীন হয়ে পার্লামেন্টের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অবৈধ ঘোষণা করা হল। পরবর্তীতে কামাল পাশার পৃষ্ঠপোষকধারী ক্ষমতায় এলে মুসলিম প্রেসিডেন্টকে ফাঁসি দেয়া হয়। আর বাংলাদেশের বর্তমান সরকার (২০০৯...) ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধানের ৫ম সংশোধনিকে অবৈধ ঘোষণা করে '৭২ সালের সংবিধানের আলোকে সংবিধানের মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর আমাদের দেশেও ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে তাফসীর মাহফিল ও ধর্মীয় সভা-সমাবেশের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

আর ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান ফ্যাসিবাদ সরকার ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দদের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্টে আটকে রেখেছেন। আর এ থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশ অচিরেই তুরস্কের ভাগ্যবরণ করবে। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাকালে দেখতে পাই ধর্মনিরপেক্ষতার পরিণাম কী? এবার দেখুন সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার আদায়ে বাধা প্রদান করে অথচ আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ধর্মীয় বিধি বিধান অনুসারে আমেরিকা কংগ্রেসে পোপের হাতে বাইবেল নিয়ে শপথ নিলেন। আর স্বার্থান্বেষী দেশ ভারত কাশ্মীর ও গুজরাটসহ অনেক প্রদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনে বাধা দেয়া হয়। উদাহরণ স্বরূপ ভারতে মুসলমানদের কুরবানী দেয়া এবং গরু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঈদের নামাজে ঈদগাহে হিংস্র শিকারি কুকুর ও শুকর মুসলমানদের ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং শিখ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ধর্মীয়সহ সকল রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে মাথায় ধর্মীয় পাগড়ি পরিধান করেন। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টেও মাথায় পাগড়ি পরিধান করেন। আর বাংলাদেশের মন্ত্রীবর্গ মন্ত্রীপরিষদে কুরআন নিয়ে শপথ করলে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেল (BBC, CNN, The India Times) সমালোচনার ঝড় তোলেন। তখন তারা মৌলবাদের ও জঙ্গিবাদের গন্ধ পান। এর সাথে আমাদের দেশের কিছু বামপন্থী মিডিয়া অপপ্রচার শুরু করে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে তাদের এই দ্বিমুখী নীতির জন্য প্রশ্ন করলে মুসলমানদের ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র ব্যতীত কিছুই পাওয়া যাবে না। আর ধর্মনিরপেক্ষত স্বয়ং কোন আদর্শ নয়, বরং এটা চরম আদর্শহীনতা (Absence of Ideology) ছাড়া আর কিছুই নয়। উদাহরণ স্বরূপ লক্ষ্য করুন আমেরিকার আইন সভায় ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে শাসনতন্ত্রের ১৮তম সংশোধনীর মাধ্যমে মদ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু, আবার ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শাসনতন্ত্রের ২১তম সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইন বাতিল করে মদকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। উভয় সিদ্ধান্তের উদ্দ্যেশই হল জাতির মঙ্গল বিধান। কিন্তু, এই দুই বিপরীত সিদ্ধান্তের বেলায়ই মদের মূল্যমান কোনো সময়ই পরিবর্তিত হয় না। ধর্মকে জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ত্যাগ করার ব্যবস্থা করলে এ চিরন্তন মূল্যমান কোথায় পাওয়া যাবে? সঠিক মূল্যমান নির্ধারণ করতে অক্ষম হলে মানব জীবন যে অবস্থার সম্মুখিন হয় তা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসমূহের মানবতাবোধের মান থেকেই অনুভব করা যায়। ধর্মনিরপেক্ষতা বাদের ফলে মানুষ প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হতে বাধ্য। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চরম অধর্মের পক্ষে ও ধর্মের চরম দুশমন। ধর্মনিরপেক্ষতার আরেক নাম ধর্মহীনতা। আর কোনো মুসলমান ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূলকথা অনুযায়ী ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে  আবদ্ধ রাখাকে ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ, ইসলামকে বলা হয় ‘Islam is the complete code of life' অর্থাৎ ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। আর আল্লাহ বলেন, ‘‘হে মুসলমানগণ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।’’ আল্লাহর কিতাবকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ না করে যারা শুধু ইসলামের কতিপয় অনুষ্ঠান নিয়েই সন্তুষ্ট, তাদের প্রতি কুরআন যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে তা যে কোন সত্যিকার মুসলমানের অন্তরকেই কাঁপিয়ে তুলবার জন্য যথেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমরা কী কিতাবের কতক অংশের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ, আর কতক অংশকে অবিশ্বাস কর?’’ যারা এরূপ করে তাদের জন্য এ দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অবমাননা ছাড়া আর কী বদলাই বা থাকতে পারে। অতএব তাদেরকে ভয়ঙ্কর শাস্তির দিকে ঠেলে দেয়া হবে। সুতরাং কুরআনের বিধান অনুসারে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ একটি কুফরী মতবাদ। মানবরচিত ভ্রান্ত বাতিল মতবাদ, ইহার অনুসরণ মুসলমানদের জন্য অবৈধ। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা মূলত রাষ্ট্রীয় দর্শনের নামে মানুষকে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত করা এবং মুসলমান জাতিকে ধ্বংস করার ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান চক্রের গভীর ষড়যন্ত্র।

শনিবার, ৬ মে, ২০১৭

দেবদাস ও তার রিলেশনশীপ স্ট্যাটাস!

১.
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হওয়া 'বিমান' পালকিতে চড়িয়া নারায়ন মুখোপাধ্যায় এর ছোট ছেলে দেবদাস ৫ বৎসর পর বিলেত হইতে দেশে ফিরিতেছে । দেবদাসের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরিয়া গ্রাম জুড়িয়া ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হইয়াছে। পুত্রের দেশে ফিরিবার সংবাদ বিশ্বব্যাপী প্রকাশ করিতে দেবদাসের মাতা 'কৌশল্যা' টুইটারে টুইট করিলেন 'my son coming soon' , ইহাতে কিঞ্চিত বিপত্তি ঘটিয়া গেল ! অনেক 'গণ্ডমূর্খ' ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কৌশল্যা কে 'গর্ভবতী' ভাবিয়া অনাগত সন্তানের মঙ্গল কামনা করিয়া বসিল !!!

বিলেতে বসিয়া দেবদাস দেশের কোন খবর লইতনা বলিলেই চলে। তাইতো যাত্রাকালে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হইতে দেশ ত্যাগ করিলেও দেশে ফিরিয়া দেখিলো একি আদলে নতুন আরেকটা বিমানবন্দর তৈরি হইয়াছে , নাম 'শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর' । দেশের এমন উন্নতি দেখিয়া দেবদাস খুশি না হইয়া পারিল না !

তবে ঢাকা হইতে মহাসড়ক ধরিয়া বাড়ি পৌছাইতে পৌছাইতে দেবদাস যোগাযোগমন্ত্রীর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করিল। সড়কের চরম দুরাবস্থা দেবদাসের বিলাতি কোমরকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঢাকার লোকাল বাসের বডির ন্যায় লক্কর-ঝক্কর করিয়া দিল।

দেশে ফিরিয়া দেবদাসের ভালই সময় কাটিতে লাগিল । বেশ কতক নতুন টিভি চ্যানেল আসিয়াছে । মাই টিভি , মোহনা টিভি দেখিতে দেখিতে দেবদাসের ছোটবেলার বিটিভির কথা মনে পড়িতে লাগিল । এ যুগের বিটিভিও হয়ত এই চ্যানেলগুলা দেখিয়া লজ্জা পায় !!

দুএক দিনের মধ্যেই 'প্রতিবেশী' পারুর সাথে দেবদাসের দেখা হইল । পারু তাহার ছোট্টবেলার 'ফ্রেন্ড' ! তের বছরের পারু আঠারোতে পা দিয়াছে । পাচ বছরে তাহার রুপ-লাবন্য-যৌবন হু হু করিয়া বাড়িয়াছে । ছোটবেলার ফ্রেন্ডকে এইবেলায় 'গার্লফ্রেন্ড' হিসাবে পাইতে দেবদাসের মন আনচান করিয়া উঠিল । এছাড়াও দেবদাসের ফেসবুক রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দীর্ঘদিন যাবৎ single হিসেবে পড়িয়া রহিয়াছে । যৌবনকালে এই স্ট্যাটাস দেখিতে বরই কদাকার ।

তবে পারু দেবদাসকে দেখিয়া তেমন একটা পাত্তা দিলনা । উল্টো তাকে দেখাইয়া দেখাইয়া সে ফোনে আলাপ করিতো । টানা দু তিন দিন সেই দৃশ্য দেখিয়া একদিন দেবদাস পারুর হাতে ধরিয়া শাকিব খানের ন্যায় চিৎকার করিয়া বলিল 'কেন পারু, কেন? কি অপরাধ করেছি আমি? বল পারু বল? কেন তুমি আমার সাথে এমন করছ পারু, কেন? আমি তোমাকে এখনো ভালবাসি পারু ...''
পারু ঝটকা মেরে হাত সরাইয়া নিয়া বলল 'সময়, নদীর স্রোত এবং নারীর মন কারো জন্য অপেক্ষা করেনা দেবদাস । শুন্যস্থান পুরন করে নিতেই হয়''

পারুর মনের খবর বাহির করিতে দেবদাস উঠিয়া পড়িয়া লাগিল ।

বিশ্বস্ত গোয়েন্দা সুত্রে দেবদাস খবর পাইল, তাহার অনুপস্থিতিতে পারু 'কোটা' ভিত্তিক পদ্ধতিতে চার চারটি প্রেম করিতেছে । কলেজে একজন , কোচিঙে একজন , গ্রামে একজন আর এলাকায় একজনের সাথে । পারু তাই চার সিমযুক্ত চাইনিজ ফোনসেট ব্যবহার করে ! কিন্তু দেবদাস হার মানিবার পাত্র নয়! সে পারুর হাত হইতে চার সিমওয়ালা ফোনসেট কাড়িয়া নিয়া, এক সিমের দামী ব্ল্যাকবেরি ফোন তুলিয়া দিল । ফোন বদলের সাথে সাথে পারুর মন ও বদলিয়া গেল। সে দেবদাসকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিল 'আমি তোমাকে এখনো ভালবাসি দেবু, বিলেত গিয়ে তুমি আমাকে ভুলে গেছ দেখে আমি অন্য ছেলেদের সাথে শুধু গণসংযোগে ব্যাস্ত ছিলাম... এই যা...'

দুটি হৃদয় এক হইল । অতঃপর দুইজনে মিলিয়া ঘরের কোনে , ক্ষেতের আইলে , কাশফুলের বাগানে , পুকুরের ঘাটে , নৌকার উপরে , গোয়াল ঘরে , গাছের ডালে বসিয়া ডেটিং করিয়া যাইতে লাগিল । তবে এমন কিছুই করিল না , যা আধুনিক ছেলে-মেয়েরা প্রেমের নামে করিয়া থাকে !!!

এরি ফাঁকে দেবদাস তাহার ফেসবুক রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বদলাইয়া "single" to "in a relationship"করিল ।

পারুর সাথে সারাদিন ঘুরাঘুরি করিয়াও দেবদাসের সাধ মিটিত না । তাই রাতেও যাতে তাহারা একে অপরের সাথে লাইভ ভিডিও চ্যাট করিতে পারে সে জন্য দেবদাস পারুকে একখানা 'দোয়েল' ল্যাপটপ কিনিয়া দিল ।

২.

দেবদাস ও পারুর প্রেমের গ্রাফের এমন ঊর্ধ্বগতি দেখিয়া পারুর মা মহা উতসাহে দেবদাসের মায়ের কাছে তাদের বিবাহের প্রস্তাব লইয়া গেলেন । দেবদাস মনে মনে আশা করিল খুব দ্রুতই তাহার স্ট্যাটাস "in a relationship" থেকে ''engaged'' এ দাঁড়াইবে , অতঃপর ''engaged'' to ''married''....

কিন্তু বিবাহের আলাপ তিস্তা চুক্তির ন্যায় বিফলে গেল । উল্টো দেবদাসের মা 'কৌশল্যা' দুই পরিবারের আভিজাত্যের তফাত দেখাইয়া পারুর মা কে অপমান করিয়া তারাইয়া দিলেন। সব অপমান সহ্য করিয়া পারুর মা সুচিত্রা 'দ্রুত বিবাহ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করিয়া পারুর বিবাহের দিন তারিখ ঠিক করিলেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে পারুর বিবাহ হইল । স্বামীর নাম ভুবন চৌধুরী । অভিজাত পরিবারের সন্তান হইলেও ভুবন চৌধুরী ছিলেন বিপত্নীক ও তিন সন্তানের পিতা।

দেবদাস ও পারুর আর ভিডিও চ্যাট করা হইল না । পারুও আলমারির কোনে 'দোয়েল' ল্যাপটপ খানা যত্নে তুলিয়া রাখিল। আর দেবদাস তাহার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করিতে বাধ্য হইল । 'in a relationship' to 'its complicated'.

পারুর সাথে বিবাহ না হয়ায় দেবদাস মানসিক ভাবে ভাঙ্গিয়া পড়িল । সে দৈনিক 'প্রথম আলু' পত্রিকার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ছুটির দিনেতে 'আপনার সমস্যা' বিভাগে চিঠি লিখিল 'আমি আমার গ্রামের এক মেয়েকে খুব ভালবাসিতাম , তাহার সাথে আমার বিবাহ হওয়ার কথা থাকিলেও হয়নি , ইহাতে আমি মানসিক ভাবে ভাঙ্গিয়া পড়েছি । বর্তমানে খুব হীনমন্যতায় ভুগিতেছি ! এখন আমি কি করিবো ?

ম্যাগাজিনের আপা উত্তর দিলেন 'তোমাকে ভেঙ্গে পরলে চলবে না , দ্রুত ঢাকা গিয়ে ভাল কোন মানসিক বিশেষজ্ঞ দেখাও।'

দেবদাস তাই করিল । বন্ধু চুনিলালকে লইয়া সে ঢাকা গেল । যাইবার কথা ছিল 'মানসিক বিশেষজ্ঞের নিকট, কিন্তু চুনিলালা বলিল 'ইহাতে মনে হয়না কোন উপকার হইবে, খামাকা কতক টাকা নস্ট হইবে , এরচাইতে গুলশান ক্লাবে গিয়া সামান্য মউজ-মাস্তি করিলে মানসিক অবস্থার এমনিতেই উন্নতি হইবে।'' দেবদাস সায় দিল । গুলশান ক্লাবে গিয়া তরল মদ গিলিতে গিলিতে তাহাদের সাথে পরিচয় হইল 'চন্দ্রমুখি' নামক এক মডার্ন 'বাইজী্র' সাথে । চন্দ্রমুখী আবার ছিল ইয়াবার ডিলার । তাই 'ইয়াবার' নতুন কাস্টমার ধরিতে সে দেবদাসের সাথে ভাব জমাইয়া ফেলিল । পুরাতন প্রেমের জ্বালা ভুলিতে দেবদাস এক হাতে মদ আর অন্য হাতে ইয়াবা তুলিয়া নিল । আর হৃদয়ে স্থান দিল সুন্দরী চন্দ্রমুখীকে । অতঃপর রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আরেকদফা চ্যাঞ্জ হইল।

এদিকে পারু শ্বশুরবাড়ির সকলকে, এমনকি মৃতা সতীনের ছেলেমেয়েদেরও আপন করিয়া লইলো। সুগৃহিণীর মতো বাড়ির সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলিয়া নেওয়ায় ল্যাপটপ খানা ছাড়িয়া অনলাইনে আসিবার সময়ও সে পাইতনা । তাই ল্যাপটপ 'দোয়েল' খাঁচার মধ্যে বন্দী হইয়াই পড়িয়া থাকিল । তবে দেবদাসকে সে ভুলিল না । পারুর মনের হার্ডডিস্ক হইতে দেবদাসের নাম ডিলিট হইলেও 'রিসাইকেল বিনে' ছিল তাহার সরব উপস্থিতি।

৩.

চন্দ্রমুখীর সাথে অবাধ মেলামেশা ও মদ্যপান দেবদাসকে গ্রাস করিয়া ফেলিল । মদ্যপান করিতে করিতে অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে প্রায়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাহার পাজামার গিট খুলিয়া যাইত! এসকল ঘটনা পারুর কানে আসিতে সময় লাগিল না।

দেবদাসের মদ্যপান পারুকে দারুন ভাবে আলোড়িত করিল । সে ফেসবুকে ঢুকিয়া দেবদাসের সম্পর্কে খোঁজ খবর লইবার চেষ্টা শুরু করিল । দেবদাসের ফেসবুক রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে 'in a open relationtip with chondromukhi' দেখিয়া পারু চমকিয়া উঠে ! পারু এক খানা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে বলিল 'মানুষ মরে গেলে পচে যায়, আর বেচে থাকলে ফেসবুক রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করে' !!

চন্দ্রমুখি সম্পর্কে জানিতে পারুর ইচ্ছা হয়। সে তাহাকে ফ্রেন্ড রিকুএস্ট পাঠায়, চন্দ্রমুখী তা একসেপ্টও করে। পুঁজোর event create করিয়া পারু চন্দ্রমুখিকে পুজোর নিমন্ত্রন করে । চন্দ্রমুখি তাহাতে রাজী হইয়া পারুদের পুজোও দেখিতে আসে।

পুঁজোর অনুষ্ঠানে চন্দ্রমুখীকে দেখিয়া পারুর স্বামী ভুবন চৌধুরী চমকে উঠিলেন। ইউটিউবে তিনি চন্দ্রমুখীর প্রচুর নাচের ভিডিও আগে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন । বেশ কিছু ডাউনলোডও করিয়াছিলেন । সে কথা তিনি সকলের সামনে ফাঁস করিয়া দেয় । চন্দ্রমুখীও অপমানিত হইয়া জনসম্মুখে পারু ও দেবদাসের পুরাতন প্রেমের রোমাঞ্চকর কাহিনি বলিয়া দেয়। সব শুনিয়া পারুর স্বামী ভুবন চৌধুরী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পারুকে গৃহবন্দি করিয়া গৃহে সামরিক শাসন জারি করিলেন ।

এমন ঘটনায় দেবদাস আর চন্দ্রমুখীর সম্পর্কে চিড় ধরিল। আর দেবদাস তাহার ফেসবুক ফ্রেন্ডদেরকে জানাইয়া দিল যে 'debdas went from being ''in a open relationtip with chondromukhi'' to ''single''

এদিকে মদ খাইতে খাইতে দেবদাসের অবস্থা 'যায়যায়দিন' । ডাক্তার তাকে দেখিয়া বলিলেন 'টাইম শর্ট, বড়জোর এক সপ্তাহ।'

মরিবার আগে দেবদাসের পুরাতন প্রেম আরকবার জাগিয়া উঠিল । শেষবেলায় সে শুধু একবার পারুকে দেখিয়া যাইতে চায় । তাই তাহার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আরেক দফা বদলাইয়া দাঁড়াইল "single" to "it's complicated."...

৪.

মৃত্যুর দোয়ারে পতিত হইয়া একদিন দেবদাস পারুর বাসার সামনে আসিয়া হাজির হইল। উদ্দেশ্য পারুকে একটিবারের জন্য দেখিয়া শেষ নিঃশ্বাস ফেলা । কিন্তু সে জানিতে পারিল, পারু গৃহবন্দী । এক্স-বয়ফ্রেন্ড হিসেবে দেবদাসও এক্স-গার্লফ্রেন্ডের বাড়ির ভিতরে ট্রানজিট সুবিধা পাইবে না । কিন্তু পারুকে তাহার একনজর দেখিতেই হইবে । এমন রাজনৈতিক সমীকরণে শেষ ভরসা ভিডিও চ্যাট !! দেবদাস ফেসবুকে ঢুকিয়া পারুকে ওয়াল পোস্ট করিল 'ami ar beshikkhon tikbo na... skype a asho... tomake shesh barer moto dekhi...' পারু ফেসবুকে অনলাইনেই ছিল। সে তৎক্ষণাৎ কমেন্ট করিল 'omg ! ok :'('

দেবদাস skype এ ঢুকিয়া পারুর অপেক্ষা করিতে লাগিল । পারুও প্রথমবারের মত 'দোয়েল' ল্যাপটপে ভিডিও চ্যাট করিবার জন্য প্রস্তুতি নিল । কিন্তু বাধিল বিপত্তি , 'দোয়েল পাখির' জানে এতো লোড সহ্য হইলনা । বুম করিয়া একখানা আওয়াজ দিয়া 'দোয়েল' পাখি উরিয়া গেল । একি সাথে দেবদাসের দেখা পাইবার সকল সম্ভবনার অবসান ঘটিল।

স্কাইপ এ বসিয়া অপেক্ষা করিতে করিতে পারুর গৃহের সামনেই দেবদাসের মৃত্যু ঘটিল । আর শেষবারের মত দেবদাস ফেসবুকে লিখিয়া গেল 'ক্ষ্যতা পুরি তোর relationship status' এর'...

একুশের আক্ষেপানুরাগ

বেশ কয়েক বছর থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারির অঙ্গীকার ছিল অফিস আদালতে শতভাগ বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিদেশী ভাষার ব্যবহার কমানো, ব্যানার, ফেস...